জীবিকার ঐতিহ্যের অংশ
দুর্গম পাহাড়ে জুমের প্রকৃতিনির্ভর পাকা ধান
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৯-০৯-২০২৬ ০৩:০৭:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৯-০৯-২০২৬ ০৩:০৭:১৫ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে এখন জুমের পাকা ধান কাটার ব্যস্ততা। সবুজ পাহাড়ের ঢালে ঢালে কোথাও সোনালি ধান পেকে উঠেছে, কোথাও চলছে ধান কাটার কাজ, আবার কোনো কোনো জুমে ধান এখনো সবুজ। বছরের দীর্ঘ শ্রমের ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত জুমচাষিরা। জুমের ধান ও সাথি ফসল ঘরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি জনপদে শুরু হবে নতুন ধানের নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতিও।
আলীকদমসহ তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জুম চাষের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এই কৃষি পদ্ধতি পাহাড়ি মানুষের খাদ্য, অর্থনীতি, সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। প্রকৃতি ও মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল এই কৃষিব্যবস্থায় একই জমিতে ধান, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, ভুট্টা, তিল, মরিচ, হলুদ, আদা, ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন সাথি ফসল উৎপাদন করা হয়।
জুম চাষের প্রস্তুতি শুরু হয় আগের বছরের শেষ দিকে। সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরবর্তী বছরের জন্য পাহাড় নির্বাচন করা হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে জঙ্গল পরিষ্কার এবং মার্চ-এপ্রিলে শুকনো গাছপালা পোড়ানোর পর প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকেন জুমচাষিরা।
বৈশাখের শুরুতে বৃষ্টি হলে পাহাড়ের ঢালে ধান ও সাথি ফসলের বীজ বপন করা হয়। বপনের সময়ের তারতম্যের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ধানও ভিন্ন সময়ে পাকে। সাধারণত আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ধান কাটা শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত তা চলে।
এরপর ধান শুকিয়ে জুমঘর থেকে মূলঘরে তোলা হয়। নতুন ধানের ভাত ও ঐতিহ্যবাহী খাবার দিয়ে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পাহাড়ি জনপদে নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
আলীকদমের আদু পাড়ার জুমচাষি মেনক্রাত ম্রো জানান, তিনি প্রায় পাঁচ একর পাহাড়ি জমিতে জুম করেছেন। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় এবার ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। তার হিসাবে, তিন একর জুম থেকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ আড়ি ধান পাবেন।
তিনি বলেন, জুমে ধানের পাশাপাশি ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন হয়। ফলে পরিবারের খাদ্যচাহিদার বড় একটি অংশ জুম থেকেই পূরণ হয়।
মাতামুহুরী রিজার্ভে জুমের ধান কাটায় নিয়োজিত পাংসিং ম্রো বলেন, ‘জুম চাষ হচ্ছে আমাদের খাদ্যের অবলম্বন। জুম চাষ করা ছাড়া উপায় নেই।’
তার ভাষ্য, জুমের সাথি ফসল নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করেও কিছু আয় করা যায়।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ক্রাতংপুং ম্রো বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন জুম চাষের ওপরও প্রভাব ফেলছে। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া, কোথাও অতিবৃষ্টি আবার কোথাও অনাবৃষ্টির কারণে ফলন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় জুম আবাদে সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একই পরিমাণ জমিতে আবাদ হয়েছে। এ বছর চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর বলেন, চলতি বছর জেলার প্রায় ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ হয়েছে। সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ বছর ফলন ভালো হওয়ার আশা রয়েছে। তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের তারতম্য থাকায় ফলনও একেক এলাকায় একেক রকম হয়।
তিনি জানান, আলীকদমের দুর্গম এলাকায় এরই মধ্যে পাকা জুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে। জুমের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উন্নত ও হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদনেও চাষিদের উৎসাহিত করছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স